অনলাইন ডেস্ক (ABN Views): নেপালের ত্রিশুলি উপত্যকার ত্রিভুবন ত্রিশুলি মাধ্যমিক বিদ্যালয়। সাধারণ আর দশটা দিনের মতোই ক্লাসে বসে পড়াশোনা করছিল শিক্ষার্থীরা। কেউ শিক্ষককে মনোযোগ দিয়ে শুনছিল, আবার কেউ ছুটির ঘণ্টার অপেক্ষা করছিল। কিন্তু কেউই জানত না, কয়েক মিনিটের মধ্যেই এক ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা পিষে দিয়ে যাবে তাদের প্রিয় বিদ্যাপীঠকে।
ঠিক সেই মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য প্রধান শিক্ষক রাজেন্দ্র দাওয়াদি-র হাতে সময় ছিল মাত্র কয়েক মিনিট। তিনি যদি একটু দ্বিধা করতেন বা স্কুল ভবনটিকে নিরাপদ মনে করে ভেতরে অবস্থান করতেন, তবে ১,৬৪৩ জন শিশুর প্রাণ কেড়ে নিত সেই ভয়াল স্রোত। কিন্তু নিজের প্রখর উপস্থিত বুদ্ধিমত্তা ও সাহসিকতা দিয়ে তিনি এক অলৌকিক ইতিহাস গড়ে তুলেছেন।
যেভাবে শুরু হয়েছিল সেই আতঙ্কজনক মুহূর্ত
গত ২৬ আগস্ট সকাল ৯টা ২০ মিনিট। প্রধান শিক্ষক রাজেন্দ্র দাওয়াদির ফোনে এক বন্ধুর কল আসে। নদীর পানি বিপদসীমার ওপরে ওঠার খবর দিয়ে তাকে দ্রুত উঁচু স্থানে সরে যেতে বলা হয়। প্রথমে স্কুলটি তিনতলা কংক্রিটের ভবন এবং নদী থেকে প্রায় ৬০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত হওয়ায় সেটিকে নিরাপদ মনে করেছিলেন দাওয়াদি।
কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই এক স্থানীয় অভিভাবক এসে জানান, নদীর পানি ভয়ংকর গতিতে বাড়ছে। পরিস্থিতি যে অত্যন্ত আশঙ্কাজনক—তা বুঝতে আর এক মুহূর্তও নষ্ট করেননি তিনি।
একটি জরুরি ঘণ্টা ও ১৬৪৩টি প্রাণের মুক্তি
বিপদ উপলব্ধি করার সাথে সাথে তিনি স্কুলের জরুরি ঘণ্টা বাজিয়ে দেন। সমস্ত শিক্ষকদের দ্রুত নির্দেশ দেন সব শ্রেণিকক্ষ খালি করে শিশুদের নিরাপদে বের করে নিয়ে যাওয়ার জন্য। শিক্ষার্থীদের মধ্যে মুহূর্তেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লেও শিক্ষকরা দ্রুত সবাইকে পরিচালনা করে নিকটস্থ একটি উঁচু স্থানের ‘বোধি বৃক্ষ’-এর নিচে নিয়ে আশ্রয় দেন।
শিক্ষার্থীরা নিরাপদ স্থানে পৌঁছানোর ঠিক কয়েক মিনিটের মধ্যেই পাহাড়ি ঢলের প্রচণ্ড স্রোত এসে আছড়ে পড়ে স্কুলে। মুহূর্তের মধ্যেই ভেসে যায় তিনতলা শক্তপোক্ত ভবনসহ আশেপাশের বহু স্থাপনা। প্রধান শিক্ষকের দ্রুততম ও সঠিক সিদ্ধান্তের কারণে স্কুলের ১,৬৪৩ জন শিশুর প্রতিটি শিশুই অলৌকিকভাবে প্রাণে বেঁচে যায়।
স্বস্তির মাঝেও সহকর্মীদের হারানোর করুণ ট্র্যাজেডি
১,৬৪৩ জন শিশুর প্রাণ বেঁচে গেলেও এই ঘটনায় ছড়িয়ে আছে এক করুণ সুর। স্কুলের দুইজন প্রিয় সদস্যকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি:
- সন্তোষ পাড়িয়া (৩২): সমাজবিজ্ঞানের এই তরুণ শিক্ষক নাস্তা করার জন্য নদীর পাশের নিজ বাসায় গিয়েছিলেন, সেখান থেকেই পাহাড়ি পানির তোড়ে ভেসে যান তিনি।
- সুলতান লামা: স্কুলের এই দায়িত্বশীল পরিচ্ছন্নতাকর্মী ক্লাসরুমের দরজাপালা বন্ধ করতে ফিরে গিয়ে আর বের হতে পারেননি, সেখানেই প্রাণ হারান।
স্থানীয় মানুষ এবং পুরো দেশ প্রধান শিক্ষক রাজেন্দ্র দাওয়াদিকে বীর ও নায়কের মর্যাদায় বসালেও তিনি বিনীতভাবে বলেন, "আমি আর কী-ই বা করতে পারতাম? আমি কোনো নায়ক হতে চাইনি, কেবল একজন শিক্ষক হিসেবে নিজের দায়িত্বটুকু পালন করেছি।"
এত বড় বিপর্যয় কীভাবে ঘটল?
বিশেষজ্ঞ ও বিজ্ঞানীদের তথ্যমতে, তিব্বত সীমান্তের কাছে লাংটাং লিরুং পর্বতশৃঙ্গের বিশাল একটি অংশের বরফ ও পাথর (প্রায় ৫০ একর জায়গা জুড়ে) ধসে পড়ে 'লেনদেখোলা' নদীর গিরিখাতে। হিমবাহ ধসের ফলে জমা হওয়া বিপুল পরিমাণ পানি ও পাথরের মিশ্রণ নদীর গতিপথ রুদ্ধ করে এই ধ্বংসাত্মক আকস্মিক বন্যা বা 'ফ্ল্যাশ ফ্লাড' (Flash Flood)-এর সৃষ্টি করে।
একটি দেশের দুর্যোগ মোকাবিলায় সামান্য একটি সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত যে কত বড় পরিবর্তন এনে দিতে পারে—নেপালের এই শিক্ষকের জরুরি ঘণ্টা বাজানোর সিদ্ধান্তটি ইতিহাসের পাতায় এক অনন্য উদাহরণ হয়ে থাকবে।

No comments: