একটি গণতান্ত্রিক সমাজে গণমাধ্যমকে বলা হয় ‘রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ’ বা সমাজের দর্পণ। কিন্তু বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাস বলছে, এই দর্পণ বারবার ক্ষমতার প্রভাবে ঝাপসা হয়ে গেছে। শেখ হাসিনার দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনামলে গণমাধ্যমকে যেভাবে একটি অনুগত ‘বয়ান যন্ত্রে’ পরিণত করা হয়েছিল, জুলাই বিপ্লব পরবর্তী সময়েও সেই একই কাঠামোর ছায়া আমরা দেখতে পাচ্ছি।
১. নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যম ও নৈতিক অবক্ষয়
অতীতের শাসনামলে গণমাধ্যমকে মূলত তিনটি স্তরে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে: মালিকানা ও বিজ্ঞাপন, কালো আইন (ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন) এবং মামলা-হামলার ভয়। এর ফলে সংবাদ কক্ষগুলো অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা থেকে সরে গিয়ে কেবল ‘প্রেস রিলিজ’ নির্ভর সাংবাদিকতায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। সত্য বলার চেয়ে চাকরি ও জীবন বাঁচানোই যখন বড় হয়ে দাঁড়ায়, তখন সাংবাদিকতা আর নাগরিকের পক্ষে থাকে না, বরং ক্ষমতার পাহারাদার হয়ে ওঠে।
২. জুলাই বিপ্লব পরবর্তী নতুন সংকট
জুলাই বিপ্লব রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রচারিত কৃত্রিম উন্নয়নের বয়ানকে তছনছ করে দিয়েছিল। কিন্তু বিপ্লব পরবর্তী সময়ে দেখা যাচ্ছে, ক্ষমতার কেন্দ্র বদলালেও গণমাধ্যমের পুরনো চরিত্র পুরোপুরি বদলায়নি। আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ অনেক গণমাধ্যমকর্মী যারা আত্মগোপনে ছিলেন, তারা এখন নতুন ভাষায় ও নতুন কৌশলে জুলাই বিপ্লবের আদর্শকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করছেন।
৩. রাজনৈতিক সমঝোতা ও ‘মব’ ন্যারেটিভ
বর্তমানে একটি পরিকল্পিত প্রচার লক্ষ্য করা যাচ্ছে যেখানে স্বতঃস্ফূর্ত গণজাগরণকে ‘মবতন্ত্র’ বা অরাজকতা হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা চলছে। এর মাধ্যমে ভবিষ্যৎ দমন-পীড়নকে নৈতিক বৈধতা দেওয়ার পথ তৈরি করা হচ্ছে। বিস্ময়করভাবে, প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি-ও এই একপেশে বয়ানের ফাঁদে পা দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বাম ও ভারতপন্থী সেকুলার গোষ্ঠীগুলো এই সুযোগে জুলাই বিপ্লবপন্থী শক্তির চরিত্র হরণ করে পুনরায় তাদের আধিপত্য বিস্তারে সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
৪. নির্বাচনের মুখে গণমাধ্যমের ভূমিকা
সামনে জাতীয় নির্বাচন। ইতিহাস বলে, নির্বাচনের আগে গণমাধ্যমকে ব্যবহার করে একটি কৃত্রিম 'হাইপ' বা জনমত তৈরির চেষ্টা করা হয়। স্বাধীন গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করার সেই পুরনো খেলা আবারও শুরু হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে। এতে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব পুনরায় অন্য দেশের বা বিশেষ কোনো গোষ্ঠীর স্বার্থের কাছে জিম্মি হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
৫. উত্তরণের পথ কী?
গণমাধ্যম সংস্কার মানে কেবল আইন পরিবর্তন নয়; এটি একটি সাংস্কৃতিক লড়াই। আমাদের এমন এক পরিবেশ তৈরি করতে হবে যেখানে:
- সাংবাদিকরা প্রশ্ন করতে ভয় পাবেন না।
- মালিকরা গণমাধ্যমকে ব্যবসার হাতিয়ার না বানিয়ে নাগরিক দায়িত্ব হিসেবে দেখবেন।
- পাঠক ও দর্শক একাধিক মতের ভেতর থেকে সত্যকে খুঁজে নেওয়ার সুযোগ পাবেন।
উপসংহার:
যে সমাজ তার দর্পণকে ক্ষমতার হাতে তুলে দেয়, সেই সমাজ শেষ পর্যন্ত নিজের ভবিষ্যৎ হারায়। অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো গণমাধ্যমকে দলীয়করণ ও পরনির্ভরশীলতা থেকে মুক্ত করা। অন্যথায়, সরকার বদলাবে কিন্তু রাষ্ট্রের চরিত্র থেকে যাবে আগের মতোই।

No comments: