ঢাকা, বাংলাদেশ — জুলাই বিপ্লবের উত্তাল দিনগুলোতে পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) সন্তোষ হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি বর্তমানে বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে এক গভীর বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এই একটি মৃত্যুকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বিভিন্ন ‘ন্যারেটিভ’ বা বয়ান কেবল আইনি বিষয় নয়, বরং জুলাই বিপ্লবের নৈতিক ভিত্তি এবং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের এক জটিল লড়াইকে সামনে নিয়ে এসেছে।
প্রেক্ষাপট: বিচ্ছিন্ন ঘটনা নাকি পুঞ্জীভূত জনরোষ?
যেকোনো রাষ্ট্রে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যের মৃত্যু দুঃখজনক। কিন্তু এসআই সন্তোষের মৃত্যুকে যখন তার সামগ্রিক প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়, তখনই সত্য আড়ালে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। জুলাই বিপ্লবের সময় সন্তোষের বিরুদ্ধে শিশু-কিশোরসহ অন্তত ১১ জনকে হত্যার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছিল। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, সেই হত্যাকাণ্ডগুলো ছিল নির্মম ও প্রকাশ্য। ৫ আগস্টের পর যে জনরোষ তৈরি হয়েছিল, তা ছিল দীর্ঘদিনের রাষ্ট্রীয় সহিংসতা ও বিচারহীনতার এক চূড়ান্ত বিস্ফোরণ।
পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি ও সুপরিকল্পিত বয়ান
বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনের পর একটি নির্দিষ্ট মহল এসআই সন্তোষকে কেবল ‘সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের’ সদস্য হিসেবে তুলে ধরে একে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছে। বিশ্লেষকদের মতে, বাম-সেকুলার এবং ভারতপন্থী অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টরা এই কৌশল ব্যবহার করে জুলাই বিপ্লবকে একটি অগণতান্ত্রিক ও সাম্প্রদায়িক আন্দোলন হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে চিত্রিত করতে চাইছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো বিপ্লবের নৈতিক বৈধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা এবং পতিত স্বৈরাচারী শাসনের দায় লঘু করা।
বিপ্লবকে ‘ক্রিমিনালাইজ’ করার অপচেষ্টা
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা মাহদী হাসানকে এই ঘটনায় গ্রেফতার এবং ডিবি পুলিশের মাধ্যমে তুলে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি একটি বিশেষ বার্তা বহন করে। এটি কেবল একটি আইনি প্রক্রিয়া নয়, বরং বিপ্লবীদের ‘অপরাধী’ হিসেবে সাব্যস্ত করার একটি বৃহত্তর প্রকল্পের অংশ বলে মনে করা হচ্ছে। আন্দোলনের নেতাদের ওপর এমন চাপ রাষ্ট্রযন্ত্রের পুরনো দমনমূলক আচরণেরই প্রতিফলন, যা সাধারণ জনগণের মধ্যে চরম অসন্তোষের জন্ম দিয়েছে।
কেন ‘ইনডেমনিটি’ বা রাজনৈতিক স্বীকৃতি প্রয়োজন?
ইতিহাস সাক্ষী দেয়, যখনই কোনো বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটে, বিপ্লবীরা প্রায়ই পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রের টার্গেটে পরিণত হন। এই কারণেই জুলাই বিপ্লবের সময়কালীন ঘটনাপ্রবাহকে বিশেষ আইনি সুরক্ষা বা ‘ইনডেমনিটি’ দেওয়ার দাবি উঠেছে।
- ঐতিহাসিক ন্যায্যতা: বিপ্লবের মুহূর্তকে সাধারণ সময়ের আইনি মানদণ্ডে বিচার করা হলে ইতিহাসের সত্য বিকৃত হয়।
- ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা: আজ যদি এই বিপ্লবকে আইনি স্বীকৃতি না দেওয়া হয়, তবে ভবিষ্যতে যেকোনো সরকার রাজনৈতিক প্রতিশোধ নিতে জুলাই যোদ্ধাদের নিশ্চিহ্ন করার সুযোগ পাবে।
ডিপ স্টেট ও ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ
বর্তমান প্রেক্ষাপটে ভারতের সাথে বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির ঘনিষ্ঠতা এবং 'ডিপ স্টেট'-এর প্রভাব বিপ্লবের অর্জনকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে, যদি জুলাই বিপ্লবের ইতিহাস ক্ষমতাবানদের কলমে নতুন করে লেখা হয়, তবে বিপ্লবীরা 'মুক্তিদাতা'র বদলে 'বিশৃঙ্খলাকারী' হিসেবে পরিচিত হবেন।
পরিশেষে:
জুলাই বিপ্লব কোনো সাধারণ অপরাধমূলক ঘটনা নয়, এটি একটি বৈষম্যহীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের স্বপ্ন। এসআই সন্তোষ হত্যাকাণ্ডকে পুঁজি করে যারা এই স্বপ্নকে ম্লান করতে চায়, তারা আসলে একটি গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের বিরুদ্ধেই অবস্থান নিচ্ছে। বিপ্লবের বিচার করার ভার ইতিহাসের ওপরই ছেড়ে দেওয়া উচিত, নতুবা এটি কেবল ন্যায়বিচারের আড়ালে রাজনৈতিক প্রতিশোধ হিসেবেই গণ্য হবে।

No comments: