বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি যেন এক উত্তপ্ত কসাইখানা। আন্তর্জাতিক আইন ও শৃঙ্খলার তোয়াক্কা না করে পরাশক্তিগুলো মেতে উঠেছে এক উন্মত্ত খেলায়। ভেনেজুয়েলা থেকে গ্রিনল্যান্ড কিংবা ইরান থেকে এশিয়া—সবখানেই যুদ্ধের দামামা বাজছে। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ আজ আর কেবল আশঙ্কা নয়, বরং এর লক্ষণগুলো প্রকট হতে শুরু করেছে।
বিশ্ব রাজনীতির সাম্প্রতিক অস্থিরতা ও অরাজকতা
বিশ্বের কিছু চাঞ্চল্যকর ঘটনা আমাদের এক চরম সর্বনাশের দিকে ঠেলে দিচ্ছে:
- সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন: মাঝ সমুদ্র থেকে রাশিয়ার বাণিজ্যিক জাহাজ তুলে নেওয়া কিংবা ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে ভিনদেশি কমান্ডো দিয়ে তুলে নিয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা আন্তর্জাতিক আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে।
- অকার্যকর জাতিসংঘ: যে আইন দিয়ে বিশ্ব শান্ত রাখার কথা ছিল, পরাশক্তিগুলো আজ সেই আইনের তোয়াক্কা করছে না। ফলে আলোচনার টেবিলের বদলে যুদ্ধের ময়দানই হয়ে উঠছে চূড়ান্ত ফয়সালার জায়গা।
- মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের মেঘ: ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার উত্তেজনা এখন বিস্ফোরণের অপেক্ষায়। আমেরিকা ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক প্রস্তুতি পুরো মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র বদলে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কে নেই কোনো 'আবেগ'
বিশ্ব রাজনীতিতে কেউ কারো স্থায়ী বন্ধু নয়। ইউক্রেনকে সহায়তার আশ্বাস দিয়ে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধের আগুনে ঠেলে দিলেও, আজ ইউক্রেন একটি পরিত্যক্ত শ্মশানে পরিণত হয়েছে। পশ্চিমারা এখন তাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। চীন ও রাশিয়া—ভেনেজুয়েলার ঘনিষ্ঠ বন্ধু হওয়া সত্ত্বেও সংকটের সময় কেবল বিবৃতি দিয়েই দায় সেরেছে। অর্থাৎ, দিনশেষে পরাশক্তিগুলো কেবল নিজেদের ভূ-রাজনৈতিক লাভ-ক্ষতির হিসেব কষে।
বাংলাদেশের জন্য বিপদ ও আমাদের সক্ষমতা
এই গ্লোবাল চেইন রিয়াকশন থেকে বাংলাদেশও মুক্ত নয়। আমাদের বঙ্গোপসাগর আর ক্রমবর্ধমান অর্থনীতির ওপর অনেকেরই শকুনের নজর রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে টিকে থাকতে হলে আমাদের যা প্রয়োজন:
- সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি: কেবল মেগা প্রজেক্ট বা রাজনীতি নিয়ে পড়ে থাকা এখন আত্মঘাতী বোকামি। আমাদের প্রতিরক্ষা বাজেট নিয়ে যারা নাক সিঁটকান, তারা জানেন না যে দুর্বল থাকাই হলো শত্রুকে দাওয়াত দেওয়া।
- প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন: অন্যের থেকে অস্ত্র কিনে সাময়িক লড়াই করা যায়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের জন্য দেশীয় ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তোলা জরুরি। নিজস্ব হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যারের কোনো বিকল্প নেই।
- আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা: বর্তমান যুগে অ্যান্টি-মিসাইল সিস্টেম এবং শক্তিশালী এয়ার ডিফেন্স আমাদের বেঁচে থাকার অধিকার।
- জাতীয় ঐক্য: অভ্যন্তরীণ বিভেদ হলো বিদেশি শক্তির প্রবেশের প্রধান দরজা। রাজনৈতিক বিভেদ ভুলে সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ইস্পাত কঠিন ঐক্য এবং একটি বিশাল রিজার্ভ ফোর্স গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
শেষ কথা
আমরা কারো জমি চাই না, কারো ওপর দাদাগিরিও করতে চাই না। কিন্তু আমাদের এক ইঞ্চি মাটিও যেন কোনো বিদেশি শক্তির লালসার শিকার না হয়, সেই সক্ষমতা অর্জন করতেই হবে। বিশ্ব রাজনীতির এই ঘূর্ণিবর্তে টিকে থাকতে হলে শক্তিশালী সামরিক ভিত্তি এবং ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতিই আমাদের একমাত্র রক্ষা কবচ।

No comments: