আন্তর্জাতিক ডেস্ক | ১০ জানুয়ারি, ২০২৬
ইরানে চলমান নজিরবিহীন সরকারবিরোধী আন্দোলন এক নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের জন্ম দিয়েছে। অর্থনৈতিক সংকট আর মুদ্রাস্ফীতির আগুনে জ্বলতে থাকা দেশটিতে এখন খোদ শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের ডাক জোরালো হচ্ছে। তবে এই উত্তাল পরিস্থিতির মাঝে সবচেয়ে আলোচিত নাম হয়ে উঠেছেন ইরানের শেষ সম্রাটের নির্বাসিত পুত্র রেজা পাহলভী।
১. দাউ দাউ করে জ্বলছে ইরান: বিক্ষোভের চালচিত্র
ইরানের ৩১টি প্রদেশে ছড়িয়ে পড়া এই বিক্ষোভ এখন আর কেবল অর্থনৈতিক দাবির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বিক্ষুব্ধ জনতা সরকারি স্থাপনা ও রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে অগ্নিসংযোগ করে বর্তমান ইসলামি শাসন ব্যবস্থার অবসানের দাবি তুলছে। তথ্যমতে:
- আন্দোলনে গত কয়েকদিনে অন্তত ৪৫ জন নিহত হয়েছেন।
- গ্রেপ্তার হয়েছেন আড়াই হাজারেরও বেশি বিক্ষোভকারী।
- পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়ে সরকার আবারও ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
২. ছাইচাপা আগুন ও রেজা পাহলভীর উত্থান
বিক্ষোভ যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই ওয়াশিংটন থেকে নতুন বার্তা নিয়ে হাজির হয়েছেন ১৯৭৯ সালের বিপ্লবে ক্ষমতাচ্যুত শাহ-এর জ্যেষ্ঠ পুত্র রেজা পাহলভী। ৬৫ বছর বয়সী সাবেক এই যুবরাজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিক্ষোভকারীদের প্রশংসা করে একে 'অভূতপূর্ব' হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, জনগণের এই স্বতঃস্ফূর্ত জাগরণে বর্তমান শাসকগোষ্ঠী গভীরভাবে আতঙ্কিত।
৩. কে এই রেজা পাহলভী? (এক নজরে ইতিহাস)
- পরিচয়: ইরানের শেষ সম্রাট মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভীর বড় ছেলে।
- বিপ্লব ও নির্বাসন: ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের সময় তিনি যুক্তরাষ্ট্রে যুদ্ধবিমান চালনার প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলেন। বাবার পতনের পর তিনি আর দেশে ফিরতে পারেননি।
- ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি: নির্বাসিত জীবনে তার ছোট ভাই ও বোন—উভয়েই আত্মহত্যা করেন। দীর্ঘ সময় লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকার পর এখন তিনি ইরানের 'অন্তর্বর্তীকালীন সরকার' গঠনের স্বপ্ন দেখছেন।
৪. দেশপ্রেম নাকি 'মির্জাফরি'? (বিতর্কিত ভূমিকা)
রেজা পাহলভীর এই সক্রিয়তাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে তীব্র সমালোচনা ও বিতর্ক। বিশ্লেষকদের একাংশ তাকে নিয়ে সন্দিহান হওয়ার পেছনে কয়েকটি কারণ তুলে ধরেছেন:
- ইসরায়েল সংযোগ: ইসরায়েল সফরে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সাথে সাক্ষাৎ এবং ইরানের ওপর ইসরায়েলি বিমান হামলার সমর্থন দেওয়ায় তাকে নিয়ে নিজ দেশেও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
- বিদেশি এজেন্ডা: সমালোচকদের মতে, তিনি ইরানি জনগণের কল্যাণের চেয়ে ইসরায়েল ও পশ্চিমা শক্তির এজেন্ট হিসেবে ক্ষমতা দখলে বেশি আগ্রহী। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই তাকে 'মির্জাফর' হিসেবেও আখ্যা দিচ্ছেন।
৫. ভবিষ্যৎ কোন দিকে?
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি সমর্থন এবং রেজা পাহলভীর উসকানি—এই দুই সাঁড়াশী অভিযানের মুখে খামেনি সরকার এখন সবচাইতে বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। প্রশ্ন উঠেছে, পাহলভী কি পারবেন বিচ্ছিন্ন বিরোধী দলগুলোকে একত্রিত করতে? নাকি তার এই চেষ্টা ইতিহাসের পাতায় হারানো রাজবংশের শেষ আর্তনাদ হিসেবেই থেকে যাবে?

No comments: