বর্তমান বিশ্বের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এক অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে ইরান ও আমেরিকার মধ্যে যুদ্ধের দামামা, অন্যদিকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে নতুন ধরনের প্রতিরোধ—সব মিলিয়ে বিশ্ব রাজনীতিতে বইছে পরিবর্তনের হাওয়া। এই সপ্তাহের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাপ্রবাহের সারসংক্ষেপ নিচে তুলে ধরা হলো:
১. ইরান-মার্কিন উত্তেজনা: যুদ্ধের হুঁশিয়ারি ও সামরিক প্রস্তুতি
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্ক এখন চরম উত্তেজনার তুঙ্গে। ওয়াশিংটন পোস্টের এক নিবন্ধে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, "ইরান আর কোনো সংযম দেখাবে না।"
- প্রতিশোধের ঘোষণা: আরাকচি জানিয়েছেন, নতুন কোনো হামলা হলে ইরান তার সমস্ত শক্তি দিয়ে পাল্টা আঘাত করবে। এটি কোনো ফাঁকা হুমকি নয়, বরং কঠিন বাস্তবতা।
- ট্রাম্পের অবস্থান: প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের নেতৃত্ব পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়েছেন এবং সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকি দিয়েছেন।
- রণতরী মোতায়েন: উদ্ভূত পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে তাদের বিমানবাহী রণতরী ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’ এবং তিনটি ডেস্ট্রয়ার মোতায়েন শুরু করেছে।
২. ওআইসি অধিবেশনে ইরানের ন্যায়বিচারের দাবি
সম্প্রতি জাতিসংঘের সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত ওআইসি-এর বিশেষ অধিবেশনে ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাঈদ খাতিবজাদে দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি ও বিদেশি হস্তক্ষেপ নিয়ে কথা বলেন।
- ন্যায়বিচার: ইরান তার নাগরিকদের হত্যার বিচার নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক মহলে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
- আঞ্চলিক সংহতি: তুরস্কসহ ওআইসির সদস্য রাষ্ট্রগুলো ইরানের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার প্রতি সমর্থন জানিয়েছে এবং যেকোনো বিদেশি হস্তক্ষেপের নিন্দা জ্ঞাপন করেছে।
৩. রাশিয়ার ভেতরে সক্রিয় ‘আতেশ’ গ্রুপ: এক গোপন লড়াই
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে এক নতুন মোড় নিয়ে এসেছে ‘আতেশ’ (Atesh) নামের একটি গোপন প্রতিরোধ সংগঠন। ক্রিমিয়ান তাতার ভাষায় যার অর্থ ‘আগুন’।
- কৌশলগত নাশকতা: এই গোষ্ঠীটি রাশিয়ার ভেতরে সামরিক অবকাঠামো ও রসদবাহী রেললাইনে নিয়মিত হামলা চালাচ্ছে। সম্প্রতি পশ্চিম রাশিয়ার ব্রিয়ানস্ক অঞ্চলে তাদের হামলায় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে রাশিয়ার সামরিক সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে।
- অভ্যন্তরীণ পতন: তাদের লক্ষ্য সম্মুখ যুদ্ধ নয়, বরং রুশ সামরিক যন্ত্রের ভেতরে ফাটল ধরিয়ে সেটিকে অচল করে দেওয়া।
৪. নিয়মভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থার পতন?
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের আলোচনায় উঠে এসেছে এক আশঙ্কাজনক তথ্য—দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী যে ‘রুলস বেসড অর্ডার’ বা নিয়মভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল, তা এখন ধ্বংসের মুখে।
- ট্রাম্পের প্রভাব: ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তগুলো (যেমন গ্রীনল্যান্ড বা ভেনিজুয়েলা সংক্রান্ত নীতি) পুরনো আন্তর্জাতিক জোটগুলোর স্থায়িত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
- বোর্ড অফ পিস: গুঞ্জন রয়েছে, ট্রাম্প বর্তমান জাতিসংঘ বা প্রচলিত ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে ‘বোর্ড অফ পিস’ নামক নতুন কোনো কাঠামো তৈরির কথা ভাবছেন।
আমাদের বিশ্লেষণ
বর্তমান পরিস্থিতিতে দেখা যাচ্ছে যে, বিশ্ব আর একক কোনো শক্তির অধীনে নেই। বিশেষ করে গ্লোবাল সাউথ বা উন্নয়নশীল দেশগুলোর কাছে এই পুরনো বিশ্বব্যবস্থা কখনোই খুব একটা ফলপ্রসূ ছিল না। ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই মুখোমুখি অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যসহ সারা বিশ্বের অর্থনীতি ও নিরাপত্তার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সবচেয়ে আপডেট খবর পেতে আমাদের সাথেই থাকুন।

No comments: