জুলাই বিপ্লবের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে, তাকে কেবল ক্ষমতার রদবদল হিসেবে দেখলে ভুল হবে। দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনের পর এটি ছিল জনগণের মনস্তাত্ত্বিক মুক্তি। কিন্তু বর্তমানে রাজনৈতিক দলগুলোর কিছু কর্মকাণ্ড ও বক্তব্য জনমনে প্রশ্ন তুলছে—আমরা কি তবে সেই পুরনো পথেই ফিরে যাচ্ছি?
১. আন্দোলনের যৌথ মালিকানা বনাম একক দাবি
জুলাইয়ের আন্দোলনটি কোনো নির্দিষ্ট দল বা নেতার একক কৃতিত্বে সফল হয়নি। এতে ছাত্র-জনতা, সাধারণ মানুষ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দল অংশ নিয়েছিল। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবিরের মতো দলগুলো, যারা রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের কারণে প্রকাশ্যে আসতে পারছিল না, তারা আড়ালে থেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই আন্দোলনে ভূমিকা রেখেছে। এই বাস্তবতাকে পাশ কাটিয়ে যখন কোনো দল আন্দোলনের পুরো কৃতিত্ব এককভাবে নিতে চায়, তখন তা বিভাজন তৈরি করে।
২. তারেক রহমানের বক্তব্য ও ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি
বিএনপি নেতা তারেক রহমানের সাম্প্রতিক 'গুপ্ত ও সুপ্ত' রাজনীতি বিষয়ক মন্তব্যটি রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে একটি সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির বহিঃপ্রকাশ। বিগত সরকার যেভাবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে নিজেদের দলীয় সম্পত্তিতে রূপান্তর করেছিল, এখন যদি বিএনপি জুলাই বিপ্লবের ইতিহাসকে একইভাবে দলীয়করণের চেষ্টা করে, তবে ফ্যাসিবাদের প্রেতাত্মাই আবার ফিরে আসবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
৩. কৃতজ্ঞতার রাজনীতি ও পরিপক্কতা
রাজনীতিতে কেবল ক্ষমতা নয়, কৃতজ্ঞতাবোধও থাকা জরুরি। বর্তমানে রাজনৈতিক দলগুলো যে মুক্ত পরিবেশে কথা বলছে বা তারেক রহমান যেভাবে রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসিত হচ্ছেন, তার পেছনে রয়েছে সাধারণ মানুষের রক্ত ও ত্যাগ। এই কৃতজ্ঞতা স্বীকার না করে অন্য শরিকদের কটাক্ষ করা বা ছোট করা ক্ষমতার দম্ভেরই প্রতিফলন।
৪. তরুণ প্রজন্মের সচেতনতা
আজকের তরুণ সমাজ রাজনীতি নিয়ে অনেক বেশি সচেতন। তারা চায় এমন এক বাংলাদেশ যেখানে অবদান অনুযায়ী মর্যাদা দেওয়া হবে। বিভিন্ন ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রদলের পরাজয় প্রমাণ করে যে, তরুণরা কোনো একক দলের আধিপত্য মেনে নিতে রাজি নয়। তারা জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন দেখতে চায়, যেখানে রাষ্ট্র হবে নাগরিকের আর রাজনীতি হবে সেবার মাধ্যম।
৫. আগামীর পথ: কোন দিকে বাংলাদেশ?
বাংলাদেশ আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে পুরনো লুটতরাজ ও দমনের রাজনীতি, অন্যদিকে জুলাইয়ের ত্যাগের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা জবাবদিহিমূলক বাংলাদেশ। রাজনৈতিক দলগুলো যদি আত্মশুদ্ধি না করে এবং পুরনো দম্ভ বজায় রাখে, তবে ইতিহাসের এই বিশাল সুযোগটি হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে।
উপসংহার:
জুলাইয়ের শিক্ষা ছিল ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। রাজনৈতিক ভিন্নতা থাকলেও একে অপরের প্রতি ন্যূনতম সম্মান ও শ্রদ্ধা বজায় রাখাই হোক নতুন বাংলাদেশের রাজনীতির মূল ভিত্তি। ইতিহাস বারবার সুযোগ দেয় না; তাই এই সুযোগটি দলীয় স্বার্থে নষ্ট করা হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না।

No comments: