ইরানের রাজপথে আজ আবারও উত্তাল স্লোগান। তবে এবারের বিক্ষোভ কেবল হিজাব আইন বা সামাজিক স্বাধীনতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি রূপ নিয়েছে চার দশকের পুরনো শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিদ্রোহে। তেহরানের গ্র্যান্ড বাজার থেকে শুরু করে ৩১টি প্রদেশে ছড়িয়ে পড়া এই আন্দোলন ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ইরানের বর্তমান রাষ্ট্রকাঠামো এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে।
১. রিয়ালের পতন ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়
ইরানি অর্থনীতি আজ খাদের কিনারায়। ডলারের বিপরীতে রিয়ালের মূল্য মান নেমে এসেছে প্রায় ১৪ লাখে। এটি কেবল একটি মুদ্রাস্ফীতি নয়, বরং দীর্ঘদিনের মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি এবং ভুল অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ফলাফল। সাধারণ মানুষ এখন তাদের দৈনন্দিন চাহিদা মেটাতেই হিমশিম খাচ্ছে, যা রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের ওপর জনআস্থাকে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে এনেছে।
২. আঞ্চলিক নীতি বনাম জনস্বার্থ
ইরান দীর্ঘকাল ধরে মধ্যপ্রাচ্যে 'প্রতিরোধ অক্ষ' (Axis of Resistance) তৈরির জন্য হামাস, হিজবুল্লাহ ও হুথিদের পেছনে বিপুল অর্থ ও শক্তি ব্যয় করেছে। কিন্তু সিরিয়ায় আসাদ সরকারের পতন এবং ইসরাইলি হামলায় হিজবুল্লাহর কোণঠাসা অবস্থা ইরানের সেই প্রভাবকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। বিক্ষোভে সাধারণ মানুষের স্লোগান— "গাজা নয়, লেবানন নয়, আমার জীবন ইরানের জন্য"—স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, তারা বিদেশের রাজনীতিতে রাষ্ট্রের ব্যয়বহুল হস্তক্ষেপ আর মেনে নিতে রাজি নয়।
৩. প্রজন্মের লড়াই: আদর্শিক দূরত্ব
ইরানের বর্তমান জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকের বয়স ৩০ বছরের নিচে। এই তরুণ প্রজন্ম ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের স্মৃতি বহন করে না। তারা এমন এক বিশ্বে বড় হয়েছে যেখানে তথ্যের অবাধ প্রবাহ রয়েছে। ফলে তারা ইসলামী প্রজাতন্ত্রের কঠোর নৈতিক বিধিনিষেধের পরিবর্তে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, কর্মসংস্থান এবং উন্নত জীবনযাত্রাকে প্রাধান্য দিচ্ছে। রাষ্ট্রের রক্ষণশীল কাঠামোর সাথে এই আধুনিক প্রজন্মের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ আজ রাজপথে প্রকট।
৪. বৈধতার সংকট ও দমনের কৌশল
আন্দোলন দমাতে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট, গণ-গ্রেপ্তার ও শক্তি প্রয়োগের পুরনো পথেই হাঁটছে তেহরান। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি অনুযায়ী, অসংখ্য মানুষ হতাহত ও বন্দী হয়েছেন। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, কেবল শক্তি প্রয়োগ করে এবার ক্ষোভ প্রশমিত করা কঠিন। কারণ, এবারের বিক্ষোভ কেবল নীতিগত সংস্কারের দাবি নয়, বরং খোদ শাসনব্যবস্থার বৈধতাকেই চ্যালেঞ্জ করছে।
৫. আগামীর চ্যালেঞ্জ: বিবর্তন নাকি পতন?
আয়াতুল্লাহ খামেনীর পরবর্তী উত্তরাধিকার প্রশ্ন এবং ক্ষমতার অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ইরানকে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। একদিকে পরিবর্তনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা, অন্যদিকে বিদেশী হস্তক্ষেপ বা যুদ্ধের ভয়—এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে ইরানি জনগণ।
উপসংহার:
ইতিহাস বলে, ইরান বারবার সংকট কাটিয়ে টিকে গেছে। কিন্তু আজকের সংকট বহুমুখী—এটি একইসাথে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক। ইসলামী প্রজাতন্ত্র যদি নিজেকে আধুনিক বিশ্বের চাহিদার সাথে মিলিয়ে সংস্কার করতে না পারে, তবে জনবিচ্ছিন্নতা রাষ্ট্রটিকে আরও দুর্বল করে তুলবে।
মূল পয়েন্টগুলো একনজরে:
- মুদ্রা সংকট: ১ ডলার সমান ১৪ লাখ রিয়াল।
- আঞ্চলিক প্রভাব: সিরিয়া ও লেবাননে ইরানের প্রভাবে বড় ধাক্কা।
- প্রজন্মগত সংঘাত: তরুণদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা।
- রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ: উত্তরাধিকার নির্বাচন ও অভ্যন্তরীণ অনৈক্য।

No comments: